সব ব্লগে ফিরে যান
রাতারগুল থেকে বিছনাকান্দি: সিলেটের জলজ অ্যাডভেঞ্চার

রাতারগুল থেকে বিছনাকান্দি: সিলেটের জলজ অ্যাডভেঞ্চার

রুবাইয়াত হোসেন Sylhet ১৬/৪/২০২৬👁️ 1 ভিউ · 👍 410 আপভোট

বর্ষাকাল মানেই সিলেট ভ্রমণ। অন্যান্য সময় সিলেটে ঘোরা গেলেও, বর্ষাকালে এখানকার জলপ্রপাত, নদী এবং বিলগুলো তাদের আসল যৌবন ফিরে পায়। আমরা ঢাকা থেকে উপবন এক্সপ্রেসে করে যখন সিলেটে নামি, তখন বাইরে ঝুম বৃষ্টি। আমাদের প্ল্যান ছিল বিখ্যাত রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট এবং পাথরের বিছানা হিসেবে পরিচিত বিছনাকান্দি ঘোরা। পানির রাজ্য এবং প্রকৃতির এই তীব্র সবুজ মিলনমেলা আমাদের এই ডে-ট্যুরটিকে করেছে এককথায় অবিশ্বাস্য। চলুন আপনাদের সাথে শেয়ার করি কীভাবে একটি পারফেক্ট সিলেট ট্রিপ প্ল্যান করবেন।

Ratargul Swamp Forest Sylhet

১. রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট: বাংলার আমাজন

সিলেট শহর থেকে মাইক্রো বা সিএনজি রিজার্ভ করে সরাসরি গোয়াইনঘাটের মোটরঘাট বা চৌরঙ্গী ঘাটে যাওয়া যায়। সেখান থেকে ছোট ছোট নৌকায় করে রাতারগুলের ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। এটি একটি স্বাদুপানির জলাভুমি বা সোয়াম্প ফরেস্ট। বর্ষাকালে গাছের অর্ধেকটাই পানির নিচে ডুবে থাকে। বনের ভেতর যত গভীরে নৌকা এগোতে থাকে, চারপাশের নীরবতা তত গাঢ় হয়। শুধু বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর পাখির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। মাঝে মাঝে সাপ বা বিভিন্ন পাখির দেখা মেলে। নৌকায় বসে বনের শান্ত জলের প্রতিফলন দেখা এক মায়াবী অভিজ্ঞতা। বনের মাঝে থাকা ওয়াচটাওয়ার থেকে পুরো রাতারগুল বনের বিশালতা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। তবে গাছের ডালপালার কারণে নৌকায় যাওয়ার সময় কিছুটা সাবধানে থাকতে হয়।

Boat passing through green forest

২. রাতারগুল থেকে বিছনাকান্দি

রাতারগুলের স্নিগ্ধতা উপভোগ করার পর আমরা রওনা দিলাম হাদারপার ঘাটের দিকে। হাদারপার থেকে ট্রলার ঠিক করে পিয়াইন নদী ধরে আমাদের গন্তব্য বিছনাকান্দি। প্রায় ১ ঘণ্টার এই ট্রলার যাত্রার সময় ভারত সীমানার উঁচু খাঁড়া মেঘালয় পাহাড় এবং ঝর্ণাগুলো অদ্ভুত মুগ্ধতা ছড়ায়। দূর পাহাড়ের কোলে মেঘ আটকে থাকার দৃশ্য দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। বিছনাকান্দিতে পৌঁছালে মনে হয় আপনি যেন পাথরের এক অনন্ত সাগরে এসে পড়েছেন। বর্ষায় মেঘালয় পাহাড় থেকে তীব্র স্রোতে পানি নেমে আসে, আর এখানকার অসংখ্য পাথরের গায়ে ধাক্কা লেগে এক অপূর্ব জলপ্রপাতের রূপ ধারণ করে। বরফের মতো ঠাণ্ডা সেই পানিতে শরীর ভেজানোর পর রাস্তার সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে মুছে যায়।

৩. খাবার-দাবার: সিলেটের পাঁচভাই রেস্তোরাঁ

বিছনাকান্দিতে ঘোরার পর প্রচণ্ড ক্ষিধে নিয়ে যখন আমরা শহরে ফিরি, তখন সিলেটের বিখ্যাত রেস্তোরাঁ 'পাঁচভাই' ও 'পানসী'তে খাওয়ার চিন্তা ছিল প্রথম। বিছনাকান্দিতেও মাঝারি মানের খাবার হোটেল আছে, তবে শহরের এই দুটি রেস্তোরাঁর আলাদা নামডাক রয়েছে। সেখানকার আস্ত রুই মাছ ফ্রাই, গরুর কালাভুনা আর বিভিন্ন পদের ভর্তা-ভাজি দিয়ে পেট পুরে খাবার খাওয়ার তৃপ্তি বলে বোঝানো যাবে না। বিশেষ করে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সাতকরা (শাতকরা) দিয়ে গরুর মাংসের স্বাদ সারা জীবন মনে রাখার মতো। দামেও এই রেস্তোরাঁগুলো বেশ সাশ্রয়ী।

Spicy beef curry in restaurant

৪. জাফলং এবং তামাবিল

অনেকেই বিছনাকান্দির সাথে জাফলংকেও ট্রিপের অংশ করেন। তবে আমরা সময় স্বল্পতার কারণে পরের দিন সকালে জাফলং যাই। খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে পিয়াইন নদীর তীরে জাফলং অবস্থিত। এর জিরো পয়েন্টে গেলে একেবারে কাছ থেকে পাহাড়ি স্বচ্ছ জলের ঝর্ণা এবং ঝুলন্ত ব্রিজ দেখা যায়। পথে তামাবিল বর্ডার দিয়ে প্রচুর পাথরবোঝাই ট্রাক ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করার দৃশ্যও চোখে পড়ে। তবে মনে রাখতে হবে, সাম্প্রতিক সময়ে পাথর উত্তোলনের কারণে জাফলং তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কিছুটা হারিয়ে ফেলেছে। এরপরও সারি সারি চা-বাগান আর পিয়াইন নদীর মায়াবী রূপ জাফলংকে পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতেই রেখেছে।

৫. কিছু জরুরি সতর্কতা

সিলেটের এই ট্যুরগুলোতে নৌকার ভূমিকা অপরিসীম। তাই ইঞ্জিন নৌকা বা ছোট ডিঙি নৌকা রিজার্ভ করার সময় ঠিকমতো দরদাম করা জরুরি, নতুবা অতিরিক্ত টাকা গুনতে হতে পারে। বিছনাকান্দির পাথরের গায়ে প্রচুর শ্যাওলা থাকে, তাই যেকোনো সময় পিছলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, তাই সাবধানে হাঁটতে হবে। বর্ষাকালে পানি খুব স্রোতযুক্ত এবং গভীর থাকে, তাই সাঁতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক। প্রকৃতির অপরূপ ভান্ডার সিলেট ভ্রমণের এইসব ছোটখাট সতর্কতা আপনার ভ্রমণকে নিরাপদ ও আনন্দদায়ক করবে। বর্ষার জলজ অ্যাডভেঞ্চার উপভোগ করার জন্য সিলেটের চেয়ে চমৎকার আর কোনো অপশন বাংলাদেশে নেই।

Clouds over green nature

লেখাটি পছন্দ হয়েছে?

লেখককে সাপোর্ট করতে আপভোট দিন!