চায়ের রাজ্য শ্রীমঙ্গল: সবুজ গালিচা
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলকে বলা হয় বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী। ঢাকা থেকে যাত্রা করে শ্রীমঙ্গলে প্রবেশের শুরু থেকেই দু’পাশের বিশাল চা বাগানের চিরসবুজ দৃশ্য আপনাকে স্বাগত জানাবে। মনে হবে কেউ যেন পাহাড়ের গায়ে মাইলের পর মাইল সবুজ গালিচা বিছিয়ে রেখেছে। প্রকৃতির এই অপরূপ স্নিগ্ধতায় কয়েকটা দিন কাটালে মানবমন সতেজ হয়ে ওঠে। আপনি যদি সবুজপ্রেমী হন এবং নির্জনতা পছন্দ করেন, তবে শ্রীমঙ্গল আপনার জন্য সেরা গন্তব্য। চা বাগানের পাশাপাশি অবারিত বনভূমি, লেক এবং জলপ্রপাত এই জায়গাকে করেছে অনন্য।
১. কীভাবে যাবেন শ্রীমঙ্গল
ঢাকা থেকে সিলেটে যাওয়ার যেকোনো বাসে আপনি শ্রীমঙ্গল পৌঁছাতে পারেন। ফকিরাপুল বা সায়েদাবাদ থেকে শ্যামলী, গ্রিন লাইন, হানিফ বা এনা পরিবহনের বাস আছে, যা ৪-৫ ঘণ্টায় শ্রীমঙ্গল পৌঁছে দেয়। তবে শ্রীমঙ্গল যাওয়ার সবচেয়ে রোম্যান্টিক উপায় হলো রেল ভ্রমণ। ঢাকার কমলাপুর থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা, কালনী বা উপবন এক্সপ্রেস প্রতিদিন শ্রীমঙ্গলের দিকে ছেড়ে যায়। ট্রেনের জানলার পাশে বসে বিস্তীর্ণ হাওর এবং চা বাগানের অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে শ্রীমঙ্গল যাওয়ার অভিজ্ঞতা দারুণ। বিশেষ করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যখন ট্রেন ধীর গতিতে এগিয়ে যায়, চারপাশের গহীন জঙ্গল এক অদ্ভুত শিহরণ জাগায়।
২. লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও জীববৈচিত্র্য
শ্রীমঙ্গলের প্রধান আকর্ষণ হলো লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। ১২৫০ হেক্টর জায়গা জুড়ে থাকা এই ট্রপিক্যাল রেইনফরেস্ট জীববৈচিত্র্যের এক বিরাট ভান্ডার। এখানে প্রবেশের পর চারপাশের নিস্তব্ধতা আর বিশাল সব পুরনো গাছের ছায়া মনকে শান্ত করে দেয়। বিখ্যাত 'হুল্লুক' বা উল্লুক ছাড়াও এখানে নানা বিরল প্রজাতির পাখি, বানর, মায়া হরিণ এবং সাপ রয়েছে। বনের ভেতর তিনটি ট্রেইল আছে: ৩০ মিনিট, ১ ঘণ্টা এবং ৩ ঘণ্টার। সঙ্গে একজন অভিজ্ঞ গাইড নিয়ে বনের গহীনে ট্রেকিং করা একটি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। খাসিয়া পল্লী ঘুরে তাদের পান-সুপারি চাষের পদ্ধতি এবং জীবনযাত্রা দেখা যায়।
৩. মাধবপুর লেক ও চা-বাগান
টি এস্টেটের ভেতর দিয়ে চমৎকার মসৃণ রাস্তা ধরে মাধবপুর লেকে পৌঁছাতে হয়। চারপাশের উঁচু এবং সবুজ চা-বাগানের মাঝখানে বিশালাকার এই শান্ত লেকটি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। লেকের জলে ফোটা রাশি রাশি নীল পদ্ম এর সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এখানকার পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দাঁড়ালে পুরো ন্যাশনাল চা বাগান এবং ভারত সীমানার আবছা পাহাড়ও নজরে আসে। শ্রীমঙ্গলে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪৯টি চা বাগান রয়েছে। ফিনলে, ইস্পাহানি বা জেরিন টি এস্টেটের চা বাগানে ঘুরে বেড়িয়ে কাঁচা চা পাতার দারুণ সুবাস অনুভব করতে পারবেন।
৪. নীলকণ্ঠ টি কেবিন: বিখ্যাত সাতরঙা চা
শ্রীমঙ্গল ভ্রমণের অন্যতম সিগনেচার মুহূর্ত হলো নীলকণ্ঠ টি কেবিনের সাত রঙের বিখ্যাত চা পান করা। রমেশ রাম গৌড়ের তৈরি এই বিশেষ চায়ের একেকটি স্তর একেক রঙের এবং একেক স্বাদের হয়ে থাকে। স্তরগুলোর মধ্যে গ্রিন টি, ব্ল্যাক টি, লেবু, দুধ ও মশলার মিশ্রণ থাকে। শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে আসা যেকোনো পর্যটকের জন্যই এই চা টেস্ট করা এক প্রকার মাস্ট-ডু লিস্টের অংশ। যদিও অনেকের মতে এর স্বাদ খুব একটা আহামরি নয়, তবে এর নান্দনিকতা আর কারিগরি দক্ষতা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।
৫. কোথায় থাকবেন এবং উপসংহার
শ্রীমঙ্গলে থাকার জন্য শহরের কেন্দ্র থেকে শুরু করে চা বাগানের ভেতরে এবং রিসোর্টগুলোতে প্রচুর অপশন রয়েছে। গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট এবং গলফ ক্লাব, টি হেভেন, লেমন গার্ডেন, শান্তি বাড়ি, দুসাই রিসোর্টের মতো প্রিমিয়াম এবং ইকো-রিসোর্টগুলো দারুণ। এর পাশাপাশি বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য শহরে ১০০০-২০০০ টাকার ভালো মানের হোটেলও রয়েছে। শ্রীমঙ্গলে গেলে পাহাড়ি সাইকেল ভাড়া নিয়ে চা বাগানের রাস্তায় সাইক্লিং করার স্বাদ আপনার ট্রিপকে পরিপূর্ণ করবে। শহরের কোলাহল ভুলে নিজেকে রিফ্রেশ করার জন্য শ্রীমঙ্গল সত্যিই এক অনবদ্য 'সবুজ গালিচা'!
লেখাটি পছন্দ হয়েছে?
লেখককে সাপোর্ট করতে আপভোট দিন!