সেন্টমার্টিন: প্রবাল দ্বীপের নীল জলরাশি
বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। টেকনাফ থেকে বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে আড়াই ঘণ্টার রোমাঞ্চকর শিপের যাত্রার পর এই দ্বীপে পা রাখলে মনে হবে আপনি কোনো বিদেশি সৈকতে এসে পড়েছেন। নীল আকাশ, স্বচ্ছ জলরাশি এবং চারদিকে সারি সারি নারকেল গাছ—সেন্টমার্টিন মানেই যেন চোখের জন্য এক আরামদায়ক ভিজ্যুয়াল ট্রিট। আধুনিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে সমুদ্রপাড়ে একান্তে কয়েকটা দিন কাটানোর জন্য এর চেয়ে সুন্দর জায়গা আর হতে পারে না। আসুন જાણી সেন্টমার্টিন ভ্রমণের পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন।
১. যাওয়ার উপায় (টেকনাফ টু সেন্টমার্টিন)
ঢাকা থেকে বাসযোগে সরাসরি টেকনাফ যাওয়া যায়। ইউনিক, হানিফ, এস আলম বা সেন্টমার্টিন পরিবহনের বাসগুলো রাত ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে সায়েদাবাদ বা গাবতলী থেকে ছাড়ে। টেকনাফ যেতে সময় লাগে প্রায় ১১-১২ ঘণ্টা। সকালে টেকনাফ পৌঁছানোর পর জাহাজ ঘাটে চলে যেতে হবে। সেখান থেকে কেয়ারি সিনবাদ, বে-ক্রুজ, গ্রিন লাইন বা এমভি ফারহানের মতো জাহাজগুলো প্রতিদিন সকাল ৯টায় সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। জাহাজের টিকেটের দাম ৭০০ থেকে ২৫০০ টাকা (আসা-যাওয়া) পর্যন্ত হয়ে থাকে। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে সিগালের ওড়াউড়ি দেখা আর বঙ্গোপসাগরের বিশালতা অনুভব করা এই যাত্রার অন্যতম সেরা আকর্ষণ। শীতকালে টেকনাফ ছাড়াও কক্সবাজার থেকেও সরাসরি শিপ সেন্টমার্টিন যায়, তবে এতে সময় বেশি লাগে।
২. সেরা রিসোর্ট ও থাকার ব্যবস্থা
সেন্টমার্টিন দ্বীপে অসংখ্য রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। পশ্চিম দিকের বিচে সূর্যাস্ত দেখা যায় বলে ওই দিকের রিসোর্টগুলোর চাহিদা সবসময় বেশি থাকে। ব্লু মেরিন, সী প্রবাল, আটলান্টিক বা কোরাল ভিউয়ের মতো রিসোর্টগুলোতে আপনি চমৎকার পরিবেশ পাবেন। সাধারণ কটেজে ১০০০-২০০০ টাকায় থাকা গেলেও, প্রিমিয়াম সি-ভিউ রুমগুলোর ভাড়া ৩০০০-১০০০০ টাকা পর্যন্ত। রাতে জোয়ারের সময় সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে ঘুমের দেশে পাড়ি জমানোর অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র দ্বীপে থাকলেই পাওয়া সম্ভব। বর্তমানে দ্বীপে রাতে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়, তাই চার্জিংয়ের ব্যবস্থা দিনের বেলাই সেরে ফেলা ভালো।
৩. স্থানীয় খাবার: সামুদ্রিক মাছের স্বাদ
সেন্টমার্টিনের মূল আকর্ষণ এর সামুদ্রিক খাবার। জেটি ঘাট সংলগ্ন বাজার বা বিচ সংলগ্ন রেস্তোরাঁগুলোতে তাজা মাছ সাজিয়ে রাখা হয়। রূপচাঁদা, কোরাল, টুনা, লবস্টার এবং বিভিন্ন সাইজের কাঁকড়া আপনি নিজেই পছন্দ করে বার-বি-কিউ বা ফ্রাই করে নিতে পারবেন। মাছের সাথে গরম ভাত এবং লইট্যা শুঁটকির ভর্তা সেন্টমার্টিনের সিগনেচার ডিশ। এছাড়া দ্বীপের অলিতে গলিতে বিক্রি হওয়া বিশাল সাইজের স্বাদু পানির ডাব খেতে ভুলবেন না। সেন্টমার্টিনের ডাবের মিষ্টি পানি সারা দেশের মধ্যে অন্যতম সেরা।
৪. ছেঁড়াদ্বীপ: প্রবালের স্বর্গরাজ্য
সেন্টমার্টিন ভ্রমণের অসম্পূর্ণ থেকে যায় যদি আপনি ছেঁড়াদ্বীপে না যান। সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত এই দ্বীপটিতে কোনো মানুষ বসবাস করে না। শুধু মৃত প্রবাল, কেয়া বন আর স্বচ্ছ নীল সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ে এই দ্বীপে। সেন্টমার্টিন থেকে ইঞ্জিন চালিত ট্রলার বা স্পিডবোটে করে ৩০-৪০ মিনিটেই ছেঁড়াদ্বীপে পৌঁছানো যায়। ভাটার সময় পানি নিচে নেমে গেলে বিশাল বিশাল পাথর আর প্রবাল জেগে ওঠে। এখানকার পানিতে আপনি জীবন্ত প্রবাল আর রঙিন মাছের ছুটাছুটি স্পষ্ট দেখতে পাবেন। সাইকেল ভাড়া করে বালুকাময় তীর ধরে ছেঁড়াদ্বীপের দিকে সাইক্লিং করা পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় কাজ।
৫. কিছু সতর্কতা ও নিয়মাবলী
সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, যা পরিবেশগত সংকটের মুখে রয়েছে। এই দ্বীপকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব। দ্বীপে কোনো ধরনের পলিথিন, চিপসের প্যাকেট বা প্লাস্টিক ফেলা কঠোরভাবে নিষেধ। এছাড়া সমুদ্র থেকে প্রবাল বা ঝিনুক তুলে নিয়ে আসা দণ্ডনীয় অপরাধ। রাতে দ্বীপের সৈকতে আলো জ্বালানো নিষেধ কারণ এতে সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়তে সমস্যা হয়। পর্যটক হিসেবে একটু সচেতন হলেই আমরা এই প্রবাল দ্বীপকে দীর্ঘকাল টিকিয়ে রাখতে পারব। সেন্টমার্টিনের নীল জলরাশি আর প্রবালের মোহময় রূপ আপনাকে বারবার সেখানে ফিরে যেতে বাধ্য করবে।
লেখাটি পছন্দ হয়েছে?
লেখককে সাপোর্ট করতে আপভোট দিন!